নাঙ্গলকোট আওয়ামীলীগকে করেছে হাসি তামাশার পাত্র, লোটাস কামালের অধ্যায় থেকে নেতাকর্মীরা মুক্তি চায়

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট: নাঙ্গলকোট আওয়ামীলীগকে হাসি তামাশার পাত্রে পরিণত করেছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি স্থানীয় সাংসদ সরকারের অর্থ মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল ও সেক্রেটারি সাবেক রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক এমপি আওয়ামীলীগের গঠনতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত দুই বছরে পাঁচ কমিটি গঠন ও বাতিল করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে । এ ভাঙ্গা গড়ার খেলা খেলে সুড়সুড়ি নিচ্ছেন সভাপতি এবং অর্থনৈতিক সুবিধা লুটছেন সেক্রেটারী ।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের শেষের দিকে নাঙ্গলকোট উপজেলা আওয়ামীলীগের একটি বিতর্কিত অর্থাত গঠনতন্ত্র পরিপন্থী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় লালমাই কলেজ আঙ্গিনায় ।
কোনরকম যাচাই বাছাই ছাড়া এলোপাতাড়ী একটা কাউন্সিলর তালিকা প্রকাশ করে সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন বর্তমান তত্কালীন জেলা আওয়ামীলীগ আহবায়ক আহম মুস্তফা কামাল ও যুগ্ম আহবায়ক বর্তমান সেক্রেটারী মুজিবুল হক ।
সম্মেলন প্রার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত না রেখেই প্রার্থীর হবার সুযোগ পেয়ে সভাপতি প্রার্থী হলেন এডভোকেট মুস্তাফিজুর লিটন । যিনি কখনও ছাত্রলীগ, যুবলীগ অথবা আওয়ামীলীগ করেন নি । তিনি নাঙ্গলকোটের অধিবাসী হলেও জন্ম বেড়ে উঠা সবই কুমিল্লা শহরে । কাউন্সিলরদের প্রলুব্ধ করে তিনিই সভাপতি নির্বাচিত হন । এক ভোটে পরাজিত হন পরবর্তীতে উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান মজুমদার এবং মাত্র ৫৪ ভোট পান বর্তমান বিতর্কিত আহবায়ক কমিটির আহবায়ক রফিকুল হোসেন। আর সেক্রেটারী পদে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন কালু । সম্মেলনের কিছুদিন পর তাদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠে । প্রকাশ হতে থাকে সভাপতি এক সময় ফ্রিডম পার্টি করতেন এবং সেক্রেটারী জাতীয় পার্টির উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ছিলেন।
সামসুদ্দিন কালু সেক্রেটারী পদের দোহাইতে স্থানীয় সাংসদ আ হ ম মুস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামালকে ম্যানেজ করে প্রথমে পৌর সভার মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন । আবার মেয়র থাকাবস্থায় একই কৌশলে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে উপজেলার চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন ভাগিয়ে নিয়ে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হন ।
২০০৬-২০১৬ দীর্ঘ ১০ বছর উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে এ দুইজন।

২০১৬ সালের শেষের দিকে মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি বাতিল করে রফিকুল হোসেনকে আহবায়ক ও অধ্যক্ষ আবু ইউসুফকে সদস্য সচিব করে ১০১ সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠিত হয় । আহবায়ক কমিটি গঠনের দেড় বছর পর অর্থাত ২০১৮ সালের মাঝা মাঝিতে কোনো সম্মেলন ছাড়াই আহবায়ক রফিকুল হোসেনকে সভাপতি ও সদস্য সচিব অধ্যক্ষ আবু ইউসুফকে সাধারণ সম্পাদক করে ১০১ সদস্য কার্য নির্বাহী কমিটি গঠিত হয় ।
এর দেড় বছর পর এ কমিটি বাতিল করে সেক্রেটারি অধ্যক্ষ আবু ইউসুফের চাচা অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন কে আহবায়ক ও অধ্যাপক ছাদেক হোসেন সহ যুবলীগের কয়েক নেতাকে যুগ্ম আহবায়ক করে ১২৯ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠিত হয় ।

জয়নাল- ছাদেক নেতৃত্বাধীন আহবায়ক কমিটির আয়োজনে ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর নাঙ্গলকোট এ আর হাইস্কুল মাঠে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা সুজিত রায় নন্দী,ইঞ্জিনিয়ার সবুর খাঁন, .মজিবুল হক এমপি । আর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব থেকে ভার্চুয়ালে বক্তব্য রাখেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন স্থানীয় নেতাদের সাথে পরামর্শ করে সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি কমিটি করবেন। কিন্ত তিনি কারো সাথে পরামর্শ না করে একক সিদ্ধান্তে সম্মেলনের ৮ দিন পর উপজেলা চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন কালুকে সভাপতি ও সদ্য ছাত্রলীগ ছেড়ে যুবলীগ যুগ্ম আহবায়ক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো ইউসুফ ভূঁইয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে ১১৭ সদস্য কার্য নির্বাহী কমিটি গঠন করেন।
কমিটি গঠনের তিন মাস পর অর্থাত চলতি বছরের ২৫ মার্চ জেলা পরিষদ সদস্য আবু বকর ছিদ্দিককে ডেকে কালু-ইউসুফ নেতৃত্বাধীন কমিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান।

কারণ স্বরূপ, পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রচার হচ্ছে সামসুদ্দিন কালু যুদ্ধাপরাধীর সন্তান। এছাড়া অভিযোগ উঠেছে ইউপি চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন বাণিজ্যের । তিনি টাকা খেয়ে প্রশাসন হাতে নিয়ে নৌকা প্রতীক প্রার্থীদের পরাজিত করে কোথাও বিদ্রোহীদের এবং কোথাও বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সহযোগিতা করেছেন। আর ইউসুফ যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান । সকল ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু এক জায়গায় হয়ে যায় ।
এবার অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ ও আবু বকর ছিদ্দিক নেতৃত্বাধীন কমিটির বয়স সাত মাস না যেতেই কোনও কারণ ছাড়াই ভাঙ্গনের সুর ! প্রথমে অর্থমন্ত্রী তার সচিবালয় কার্যালয়ে কতেক নেতা নিয়ে বৈঠক বসেন । বৈঠকে হালকা উত্তেজনা দেখা দেয়ায় সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক মুলতুবি করা হয় ।
পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ নেতা চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এর নেতৃত্বে তার সংসদ কার্যালয়ে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় । বৈঠকে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক সহ নাঙ্গলকোট উপজেলা আওয়ামীলীগের ২০ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন। নিজ ইচ্ছায় কমিটি ভাঙা গড়ার খেলায় মেতে থাকায় সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল ও সাবেক রেলপথ মন্ত্রী মজিবুল হককে ভত্সনা করলেন এবং তিনি বিরাজমান সমস্যা নিরসনে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন । কমিটির সদস্যরা হলেন, বর্তমান সভাপতি অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ, সেক্রেটারী আবু বকর ছিদ্দিক, মুস্তাফিজুর রহমান লিটন, সামসুদ্দিন কালু’, ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ , ছাদেক হোসেন ও রফিকুল হোসেন।
বিরাজমান সমস্যা নিরসন কমিটি পাঁচ দিনের মধ্যে একটি রুট তৈরি করে আল মাহমুদ স্বপনের নিকট দাখিল করবে এবং তিনি তাহা সাংবিধানিক নেতা আওয়ামীলীগ সভাপতির নিকট উপস্থাপন করবেন । কিন্ত সে পথে না গিয়ে তড়িগড়ি করে সভাপতি অধ্যক্ষ আবু ইউসুফকে ও সেক্রেটারী আবু বকর ছিদ্দিককে বাদ দিয়েই ঔদিনই অর্থমন্ত্রীর গুলশানের বাসভবনে বৈঠক বসেন । বৈঠকে রফিকুল হোসেনকে আহবায়ক ও ছাদেক হোসেন সহ ছয়জনকে যুগ্ম আহবায়ক করে ২২ সদস্যের কমিটি পরের দিন ইউসুফ ভূঁইয়ার ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করা হয় । তাতে আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বরাত দেয়া হয় । বিষয়টি সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের দৃষ্টিগচর হলে তিনি আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কেন্দ্রের নির্দেশনা ছাড়া কমিটি বাতিল করা যাবে না। সংগঠন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলবে। কারও ইচ্ছায় নয়। এটাই আমার নির্দেশ ।
এতে পরিস্কার বুঝা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটির বরাতে প্রচারিত আহবায়ক কমিটি অর্থমন্ত্রীর মন গড়া। যাহা সম্পূর্ণ অবৈধ। আরও প্রমাণিত অর্থমন্ত্রী মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন!
আহবায়ক কমিটি গঠনের সংবাদে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ (সভাপতি)ও আবু বক্কর ছিদ্দিক (সম্পাদক) কমিটির নেতাকর্মীরা । সম্পৃতি তারা হরতাল ও অবরোধ বিরোধী এক সমাবেশে অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ তার বক্ততায় স্হানীয় সংসদ ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে হুঁসিয়ারী দিয়ে বলেছেন কমিটি নিয়ে তালবাহানা করলে অর্থমন্ত্রীকেও ছাড় দেয়া হবে না । এদিকে দীর্ঘ দিন থেকে স্হানীয় সংসদ ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এর অনুপস্থিতির কারণে তার অনুসারী কয়েকজন নেতা বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক হয়ে গেছেন। এতে ত্যাগী ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হাতাশা বিরাজ করছে।

কমিটি ভাঙা গড়ার অভিযোগ ছাড়াও অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের অভিযোগ পাহাড়সম ।গত পাঁচ বছরে নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছেন মাত্র তিনবার। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় বলে এসেছেন, জনপ্রতিনিধিদেরকে জনসম্পৃক্ত হতে । অর্থমন্ত্রী সম্পূর্ণ তার উল্টো। তিনি একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন। জনগণ তো দূরের কথা দলীয় নেতা কর্মীরাও তাহার দেখা পান না। নেতা কর্মীরা তাকে শতবার ফোন দিয়েও যোগাযোগ করতে পারেন না। গত ১৫ বছরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের তৃণমূলের কর্মীদেরকে বাদ দিয়ে, যুদ্ধ অপরাধীদের সন্তান, বিএনপি জামাতের লোকদেরকে করেছেন- উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি,ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন। পৌর জামাতের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কে করেছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কে করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। যেসব বিএনপি নেতাদের ভয়ে বিভিন্ন ইউনিয়নে, আওয়ামী লীগের লোকজন যেতে পারত না, তাদেরকে নৌকা প্রতীক দিয়ে বানিয়েছেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। দলীয় সংগঠনের গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে নিজের খুশি মত দলীয় সংগঠন,সহযোগী অঙ্গ সংগঠনের কমিটি করেন, যখন খুশি ভাঙ্গেন।
গত পাঁচ বছরে সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে মন্ত্রণালয় সবচেয়ে কম উপস্থিতি ছিল অর্থমন্ত্রীর ।
দলীয় নেতাদের কাজ বিপদে জনগণের পাশে থাকা। কিন্তু অর্থমন্ত্রী করোনাকালীন সময়ে নিজ বাসা থেকে বের হননি । দুই বছর, জনগণের পাশে থাকা তো দূরের কথা।। মশার ভয়ে কোথাও যান না । এক সেমিনারে মশা উড়তে দেখে ভযে বক্তব্যই ভুলে গেছেন। জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে উপস্থাপ তিনি বারবার ভুল করে, কি বলবেন বুঝতে না পেরে,মাননীয় স্পিকার বলে দেওয়ার পরেও তিনি ঠিকভাবে কথা বলতে না পেরে সরকারকে সমালোচনার মধ্যে ফেলে দেন ।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপা বারবার বলে আসছেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন তারাই পাবেন যারা জনসম্পৃপ্ত,কর্মীবান্ধব এবং জনগণের কাছে জনপ্রিয়।কুমিল্লা-১০ সংসদীয় আসনের তিনবারের সাংসদ মুস্তফা কামাল এমপি এলাকায় জন বিচ্ছিন্ন, দলীয় নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন।। তাই এবার মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশেরত্ন শেখ হাসিনা মুস্তফা কামালের এই বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনা করবেন।
তাছাড়া দীর্ঘদিন গুরুতর অসুস্থতায় ভুগতেছেন। দু-তিন মাস পর পর তিনি দেশের বাইরে যাওয়া লাগে চিকিৎসার জন্য। প্রায় ৮০ বছর বয়স্ক একজন মানুষ যিনি গুরুতর অসুস্থ এবং এখন কথা বললে এক ঘন্টা পরেই ভুলে যান, স্মৃতিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন।
এমতাবস্থায় আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উনাকে আ’লীগ দলীয় মনোনয়ন বিবেচনা করা হয় তাহলে সেটা আওয়ামীলীগের জন্য আত্মঘাতী । এ বিষয়ে আওয়ামীলীগ মনোনয়ন বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *