শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখা দেশজুড়ে দ্রুত এগিয়ে চলছে

শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখা দ্রুতগতিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বিগত ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। শাখা ব্যাংকের মতোই বেশ কিছু ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় লেনদেন হচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখাগুলো মূল ব্যাংকের মতোই সেবা দিচ্ছে। ওসব এজেন্টরা সবাই মূল ব্যাংকের মতোই মুনাফাভিত্তিক ব্যাংকিং করছে। এজেন্ট ব্যাংকের প্রতিটি আউটলেটে গড়ে ৪ থেকে ৫ জন সেবা প্রদান করছেন। তারা সবাই স্থানীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মী। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এজেন্ট ব্যাংক বড় ভূমিকা রাখছে। আর শুধমাত্র ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী মাত্র ৭ বছরেই এজেন্ট ব্যাংকের গ্রাহক বেড়ে এক কোটির কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলোর এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা ইউনিয়ন পর্যায়েও চালু হয়েছে। আর এজেন্টরা আমানত রাখা, ঋণ বিতরণ ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি স্কুল ব্যাংকিং চালু করেছে। শুধু তাই নয়, এজেন্টরা এখন সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর ভাতাও বিতরণ করছে। তবে ডাচ-বাংলা ও ব্যাংক এশিয়া এবং আরো দু’একটি ব্যাংক মুদি দোকানদারসহ যাকে তাকে এজেন্ট বানানোয় ওই সেবার প্রতি মানুষের আস্থাও কিছুটা কমছে।
সূত্র জানায়, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক।ম ব্যাংকটির গ্রাম-গঞ্জের গ্রাহকরা সুপ্রশিক্ষিত এজেন্ট ব্যাংকারের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্স অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষ হাতে পাচ্ছে। এমনকি সবাই সেখানে সবাই বিদ্যুৎ বিলও দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি হাজার হাজার গ্রাহক প্রতি মাসে এসে ডিপিএসের টাকা জমা দিচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন ধরনের মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়ী হিসেবে ১০ লাখ, ২০ লাখ বা তারও বেশি টাকা জমা করছে। পাশাপাশি গ্রাহকরা তাদের বীমার মেয়াদ পূরণ হলে টাকা যেমন তুলতে পারছে, প্রিমিয়ামের টাকাও জমা দিচ্ছে। অবসর নেয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এজেন্ট শাখা থেকে পেনশনের টাকা তুলছে। শিক্ষকরা প্রতি মাসে বেতন তুলছে। সুযোগ পেলেই স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও সেখানে এসে টাকা জমা করছে। কৃষক থেকে শুরু করে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরাও এজেন্ট শাখায় হিসাব খুলছে।
সূত্র আরো জানায়, করোনা মহামারীর মধ্যেও ২০২০ সালে ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার ২৬১টি নতুন এজেন্ট আউটলেট চালু করেছে। এ সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৪২ হাজার। আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৪৮ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। তার মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে ২২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। করোনার মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো টাকা ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখাগুলো থেকে আসছে। প্রবাসী আয় গ্রহণ ও টাকা জমা রাখার জন্য এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে অনেকে নতুন হিসাব খুলছে। অনেকে বিদেশ যাওয়ার আগে এ্যাকাউন্ট খুলে যাচ্ছে। বাসার পাশে সেবা পাওয়া ও সঞ্চয়ের সুবিধার জন্যও অনেকে এজেন্টের কাছে হিসাব খুলেছে।
এদিকে দেশে ব্যাংক এশিয়া প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেয়া শুরু করে। এখন ২৪টি ব্যাংক ওই সেবা দিচ্ছে। সারাদেশের প্রায় ১৫ হাজার আউটলেটে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চলছে। ওই সেবায় আমানত জমা হয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন এই ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে ৮২ লাখ গ্রাহক হিসাব খুলেছেন। ডিসেম্বর শেষে ওই সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার কথা রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে এজেন্টের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ১৬৩, যা গত মার্চে ছিল ৮ হাজার ২৬০। সেপ্টেম্বর শেষে আউটলেট বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ১৬টি, মার্চে যা ছিল ১১ হাজার ৮৭৫টি। সেপ্টেম্বর শেষে গ্রাহক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ লাখ ২১ হাজার ৮৯৩ জনে, যা মার্চে ছিল ৬৪ লাখ ৯৭ হাজার ৪৫১ জন। অর্থাৎ করোনার ৬ মাসে গ্রাহক বেড়েছে ১৭ লাখ ২৪ হাজার ৪৪২ জন। আর মার্চ-সেপ্টেম্বরে নতুন যে হিসাব খোলা হয়েছে, তার মধ্যে নারীদের হিসাবের সংখ্যা ছিল সোয়া ৮ লাখ। ত্তে নারী গও্হকের হিসাবের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৭ লাখ ৪৯ হাজার, মার্চে যা ছিল ২৯ লাখ ৫৬ হাজার। বœ রমাট ৮২ লাখ হিসাবের মধ্যে গ্রামীণ হিসাবই ৭১ লাখ ১২ হাজার। মার্চে ওই সংখ্যা ছিল ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার। অর্থাৎ ৬ মাসে গ্রামের মানুষদের হিসাব বেড়েছে ১৫ লাখ ২৯ হাজার। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গত সেপ্টেম্বরে আমানত বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা, মার্চে ছিল ৮ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। ওই সময়ে আমানত বেড়েছে ৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা, মার্চে যা ছিল ৬৭৩ কোটি টাকা। বেড়েছে ৪১৩ কোটি টাকা। তাছাড়া জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে যেখানে এজেন্টদের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, সেখানে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তা বেড়ে হয়েছে ৩৯ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মনিরুল মওলা জানান, দেশে ২০১৪ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। আর ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক এ কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা মানুষকে আগ্রহী করে তুলেছে। ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের ৪৬২ উপজেলায় পৌঁছে গেছে। বর্তমানে দেশজুড়ে ২ হাজার ২৭৬ এজেন্ট এ সেবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স আহরণ ও আমানতের দিক থেকে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং এখন শীর্ষ অবস্থানে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *