Recent News
সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধ থাকা সব রেলপথ চালুর উদ্যোগ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সব রেলপথই চালু করা হচ্ছে। একে একে চালু হচ্ছে ওসব রেলপথ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ৮টি রেললাইন সংযোগ ছিল। স্বাধীনতার আগেই ওসব লাইন বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে দু’দেশের সরকারের উদ্যোগে প্রথমে ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়। ট্রেনটি ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে দর্শনা-গেদে রুটে চলাচল করছে। তারই ধারাবাহিকতায় বেনাপোল-পেট্রাপোল, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি, বিরল-রাধিকাপুর, রোহনপুর-সিঙ্গাবাদ রুটে ট্রেন যোগাযোগ চালু করা হয়। বর্তমানে চালু থাকা ৫টি রুটের মধ্যে বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। একই সঙ্গে চালু ৫টি রুট দিয়ে মালবাহী ও পার্সেল ট্রেনও চলাচল করছে। ২৬ মার্চ চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করবে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিবেশী দু’দেশের মধ্যে রেলওয়ের সংযোগ পয়েন্ট চালুর মধ্য দিয়ে দু’দেশেরই যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে আমূল পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মধ্যে ৮টি পুরনো রেললাইন রয়েছে। ওসব রেললাইন দীর্ঘদিন আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন বন্ধ লাইনগুলোর ভেতর থেকে ৫টি চালু হয়েছে। বাকিগুলো খুব শিগগিরই চালু হবে। ওই লক্ষ্যে আখাউড়া-আগরতলা, শাহবাজপুর-মহিষাসন ও ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ নির্মাণ কাজ দ্রুত চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দু’দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগের ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দু’দেশের সরকারই বন্ধ থাকা লাইনগুলো পুনরুদ্ধারে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। ফলে সবগুলো লাইন চালু হলে দেশ দুটির মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি পাবে। যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সূত্র জানায়, ঢাকা-কলকাতা যাত্রীবাহী মৈত্রী এক্সপ্রেস দর্শনা-গেদে হয়ে সপ্তাহে ৫ দিন চলাচল করছে। খুলনা-কলকাতা যাত্রীবাহী বন্ধন এক্সপ্রেস চলাচল করছে বেনাপোল-পেট্রাপোল রুটে সপ্তাহে ২ দিন। গত ১৭ ডিসেম্বর চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রুটে মালবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী ওদিন মালবাহী ট্রেন চালুর মধ্য দিয়ে রুটটি উদ্বোধন করেন। ওই রুটে আগামী বছরের ২৬ মার্চ থেকে যাত্রীবাহী ট্রেনও চলাচল করবে। তাছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রেল সংযোগ সম্প্রসারিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে। ওই লক্ষ্যে আর্থিক, কারিগরি, অপারেশনাল এবং অবকাঠামোর উন্নতিতে ভারত সরকার ঋণ দিচ্ছে। আন্তঃদেশীয় মালগাড়ি চলাচল, গেজ কনভার্সন অর্থাৎ মিটার গেজ লাইনকে ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা, রোলিং স্টক অর্থাৎ ইঞ্জিন, ওয়াগন ও যাত্রীবাহী কোচ আধুনিকীকরণে সহযোগিতা করছে। তাতে দু’দেশই লাভবান হচ্ছে। ইঞ্জিন, কামরা, ওয়াগন একই প্রযুক্তির হওয়ায় দ্রুত যাত্রী ও মাল পরিবহনের সময় ও খরচের অনেক সাশ্রয় হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, আখাউড়া-আগরতলা ও শাহবাজপুর-মহিষাসন রুট নির্মাণে উভয় দেশ দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে। ইতোমধ্যে ওই দুই প্রকল্পে ৫০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। ৯৮০ কোটি রুপি ব্যয়ে ওই প্রকল্পে বাংলাদেশ অংশের ১০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণে ৪৭৮ কোটি রুপি এবং ভারতের ৫ কিলোমিটার লাইন নির্মাণে ৫৮০ কোটি রুপি ব্যয় ধরা হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রথমে ওই প্রকল্প নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আগামী ২০২১ সালে প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন ওই রেলপথ স্থাপন হলে যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে মালবাহী ট্রেনও চলাচল করবে। ওই রেলপথ নির্মাণ হলে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরার দক্ষিণতম সীমান্ত শহর সাব্রুমকে যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আগরতলা হয়ে সরাসরি ট্রেনযোগে ভারতের যে কোনো রাজ্যে ভ্রমণ করা যাবে।
এদিকে শাহবাজপুর-মহিষাসনে বাংলাদেশ ও ভারতের আসামের সঙ্গে সরাসরি ট্রেন চলাচল ছিল। দু’দেশের মধ্যে ১১ কিলোমিটারের ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টটি ২০০২ সালের ৭ জুলাই বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে একটি রেলপথ সংযোগের জন্য আসামের চা উৎপাদনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৯১ সালে ওই রেলপথটি নির্মাণ করেছিল। রুটটি ১৯৮৮ সালের দিকে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ২০০২ সালের ৮ জুলাই এ রুটটি পুরোপরি বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির ৩০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়েছে।
অন্যদিকে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথটি ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ওই পথে ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টের মাধ্যমে ভারতে ও নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যাত্রী ও পরিবহন করা সহজ। ফলে ওই রুট ফের চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দু’দেশের সরকার। ১৭ ডিসেম্বর চালু হওয়া ওই রুট বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যে সহায়ক হবে। রেলপথটি বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের রেলই ব্যবহার করবে। ভারতের রেল যেমন এই পথ ব্যবহার করে শিলিগুড়ি যাবে, তেমনি বাংলাদেশের রেলপথটি ব্যবহার করে শিলিগুড়ি থেকে যাত্রী-পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে। বর্তমানে নেপাল ও ভুটান বাংলাদেশের মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে মালামাল পরিবহন করতে আগ্রহী। কিন্তু তা সড়কপথে করায় খরচও বেশি। কিন্তু ওই রেলপথটি চালু হয়ে শিলিগুড়ির সঙ্গে যুক্ত হলে বাংলাদেশের রেলপথটি ব্যবহার করে শিলিগুড়ি যেতে পারবে। ফলে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গেও এই পথে আমদানি-রফতানির সুযোগ হবে। তাছাড়া ওই রেলপথ কলকাতা থেকে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ঈশ্বরদী-পার্বতীপুর-সৈয়দপুর-নীলফামারী-ডোমার-চিলাহাটি হয়ে ভারতের হলদিবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাওয়া যাবে।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন জানান, বাংলাদেশ-ভারতের সঙ্গে এক সময় যেসব রেলপথ চালু ছিল তার সব ক’টি চালু করা হবে। বর্তমান সরকার রেলে আমূল পরিবর্তন করছে। তারই ধারাবাহিকতায় দু’দেশের মধ্যে বন্ধ থাকা রেলপথগুলো চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্ধ থাকা ৫টি রেলপথ চালু হয়েছে। বাকি রেলপথগুলো নির্ধারিত সময়েই চালু হবে। বন্ধ রেলপথগুলো চালু করতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কারণ ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ে ও এশিয়ান রেলওয়েতে সম্পৃক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক বাড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *