Recent News
দেশের লাখ লাখ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধে কঠোর হচ্ছে জ্বালানি বিভাগ

দেশে লাখ লাখ গ্রাহক অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে গ্যাস ব্যবহার করছে। তবে শেষ হচ্ছে অবাধে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের দিন। ইতিমধ্যে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই সকল অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। অবৈধ সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে আরো কঠোর হচ্ছে জ¦ালানি বিভাগ। ওই পরিকল্পনায় অবৈধ ব্যবহারকারীদের ছোট ছোট জোনে ভাগ করে লাগাতার অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কারণ বর্তমানে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে সরকার। আর দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে এলএনজির দাম সমন্বয় করেই বিক্রি করা হচ্ছে গ্যাস। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানির সরবরাহ করা গ্যাসের একটি বড় অংশই চুরি হয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারের কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৯৭ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস লাইন রয়ে গেছে। সরকারি কোনো গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ওই লাইন নির্মাণ না করলেও স্থানীয়ভাবে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঠিকাদাররা মিলেমিশে ওই গ্যাসলাইন নির্মাণ করেছে। সেখান থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে গ্যাসের লাইনও দেয়া হয়েছে। আবার ওসব গ্রাহক থেকে নিয়মিত বিলও আদায় করা হয়। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আদায়ের ঘরে ওই অর্থ জমা পড়ে না। বরং প্রভাবশালীদের পকেটেই গ্যাসের বিপুল টাকা প্রতিমাসেই চলে যাচ্ছে। জ¦ালানি বিভাগ গত নবেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গাতে ৩ লাখ ১৭ হাজার ২৭৫টি অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করেছে। তারমধ্যে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই লাখ ৫২ হাজার ৪৪৩টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ওই সময় ৩৪৪ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগের পাইপলাইনও উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে এখনো ওই ধরনের ২৬৩ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়ে গেছে। যা দিয়ে অবাধে গ্যাস চুরি যাচ্ছে। পাশাপাশি এখনো ৬৩ হাজারের মতো অবৈধ গ্রাহকও রয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, সারাদেশে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকাতে চুরির প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের সুবিধা বিবেচনায় যার যার এলাকার গ্যাস চুরি বন্ধ করতে দিতে চায় না। তারা মনে করে তাতে তাদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে। কেবল আবাসিকেই নয়, বাণিজ্যিক-শিল্প এবং সিএনজিতেও গ্যাস চুরি হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ দিয়ে সরকারের শত শত কোটি টাকার গ্যাস বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। জ¦ালানি বিভাগের বিচ্ছিন্ন করা সংযোগের মধ্যে বাণিজ্যিক খাতের ২০২টি, শিল্প খাতের ৮৭টি, সিএনজি ২২টি এবং ক্যাপটিভ সংযোগ ৪১টি ছিল। জ¦ালানি বিভাগ গত ৭ সেপ্টেম্বর অবৈধ সংযোগ বন্ধ করার নির্দেশনা দেয়। দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় দুই মাসের মধ্যে সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেজন্য জ¦ালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে (অপারেশন) প্রধান করে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। ওই কমিটি সরাসরি মাঠ পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যাসসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ করছে। মূলত তার পরই অবৈধ সংযোগ বিচ্ছন্ন করতে গেলে যে প্রতিরোধের শিকার হতে হতো তা কমে এসেছে। গত কয়েক বছর ধরেই অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার ঘটেছে। আর তার আওতা এতো বিশাল যে মাত্র দু’মাসে সব লাইন কেটে শেষ করা সম্ভব না। সেজন্য ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি কর্মপরিকল্পা প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই পরিকল্পনাতে যেসব অবৈধ গ্যাস ব্যবহার জোন রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করা হবে। তারপর ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছন্ন করা হবে।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে গ্যাস সরবরাহে সিস্টেম লস ৫ ভাগের একটু বেশি। কিন্তু এই সিস্টেম লসের পুরোটাই আবাসিক সংযোগসহ বেসরকারি ৪০ ভাগ গ্রাহকদের জন্য হচ্ছে। সার কারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সরকারি প্রতিষ্ঠান যে ৬০ শতাংশ গ্যাসের গ্রাহক রয়েছে সেখানে কোনো সিস্টেম লস নেই। আবার অন্য বিতরণ কোম্পানিতে তেমন একটা সিস্টেম লস না থাকলেও তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে সব থেকে বেশি সিস্টেম লস হচ্ছে। কোন কোন মাসে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির সিস্টেম লসের পরিমাণ ৭/৮ ভাগও হয়ে থাকে। তাতে বোঝা যায় ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকাতে বেশি গ্যাস চুরি হচ্ছে। গ্যাস যেহেতু পাইপলাইনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় তাই এতো বিপুল পরিমাণ সিস্টেম লস হওয়ার কোন কথা নয়।
এদিকে জ¦ালানি বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ যে কমিটি রয়েছে তারা মনে করছে একবারে বড় এলাকা ধরে এটি করা সম্ভব নয়। সেজন্যই একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জ¦ালানি বিভাগের নবেম্বরের সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইতিমধ্যে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কর্মপরিকল্পনা জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে। এখন দেশে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ছাড়াও কর্ণফুলী, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল এবং সুন্দরবন নামে আরো পাঁচটি কোম্পানি রয়েছে। কিন্তু ৫টি কোম্পানি মিলে যা গ্যাস বিতরণ করে, তার চেয়ে তিতাস একাই বেশি গ্যাস বিতরণ করে।
অন্যদিকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভায় প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ঢাকার আশপাশে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপিদের বিরোধিতা ও অসহযোগিতার কথা তুলে ধরেন। ওই সভায় কোন রাজনৈতিক চাপের কাছে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কার্যক্রম বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত হয়।
এ প্রসঙ্গে জ¦ালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবুল মনসুর জানান, নারায়ণগঞ্জেই এখন মূলত বেশির ভাগ অবৈধ সংযোগ রয়েছে। অবৈধ সংযোগ বিছিন্ন করার ক্ষেত্রে নানামুখী চাপ উপেক্ষা করে কাজ করতে হয়। সেজন্য নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে কাজ করতে হচ্ছে। তবে যাই হোক না কেন আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যাবে বলে আশাবাদী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *